ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত হযরত আবদুল আজিম হাসানি (আ.)-এর পবিত্র মাজারের তত্ত্বাবধায়ক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজী আসকার ঐক্য সপ্তাহ উপলক্ষে হাওজা নিউজ এজেন্সি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদার এবং বিভেদ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ মুসলমান ১২ রবিউল আউয়ালকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন হিসেবে মনে করেন। অন্যদিকে শিয়া মুসলমানরা ১৭ রবিউল আউয়ালকে মহানবী (সা.) এবং ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জন্মদিন হিসেবে উদযাপন করেন। এই দুই তারিখের মধ্যবর্তী সময়কে ‘ঐক্য সপ্তাহ’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি এবং ইসলামী বিশ্বের সংহতি জোরদারের লক্ষ্যে। ইমাম খোমেনী (রহ.)-ও এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
ঐক্যের প্রতি কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা
হযরত আবদুল আজিম (আ.)-এর পবিত্র মাজারের তত্ত্বাবধায়ক পবিত্র কোরআনে ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, ইসলাম ঐক্য ও সংহতির বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا.
“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” [সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩]
তিনি বলেন, এই আয়াতে সব মুসলমানকে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে এবং বিভেদ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পবিত্র কোরআন মুসলমানদের পারস্পরিক বিবাদ ও সংঘাত থেকে সতর্ক করেছে। কারণ, পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘাত তাদের শক্তি দুর্বল করে এবং তাদের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ.
“তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি-সামর্থ্য বিলীন হয়ে যাবে। আর ধৈর্য ধারণ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” [সূরা আল-আনফাল, ৮:৪৬]
সুতরাং মুসলমানরা যদি বিশ্বে শক্তিশালী ও মর্যাদাবান হতে চায়, তাহলে তাদের পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে হবে।
ঐক্যের অর্থ মতপার্থক্য দূর করা নয়
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজী আসকার জোর দিয়ে বলেন, ঐক্যের অর্থ মতপার্থক্যহীনতা নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মত ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে। কিন্তু মতপার্থক্য যেন শত্রুতা, সংঘাত এবং ইসলামী সমাজের সংহতি বিনষ্টের কারণ না হয়—সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ঐক্য সপ্তাহের অর্থ এই নয় যে সুন্নিরা শিয়া হয়ে যাবে কিংবা শিয়ারা সুন্নি হয়ে যাবে। বরং ঐক্যের অর্থ হলো নিজেদের অভিন্ন বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
তিনি বলেন, সব মুসলমানের রব এক, নবী এক এবং কিবলা এক। ধর্মের মৌলিক বিষয় ও বহু মূল্যবোধেও তাদের মধ্যে মিল রয়েছে। তাই এসব অভিন্ন বিষয়কে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
মুসলমানদের ঐক্যই তাদের শক্তি
তিনি আরও বলেন, শিয়া মুসলমানরা যদি সুন্নিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মুসলমানরা পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে শত্রুরা খুব সহজেই ইসলামী বিশ্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আক্রমণের সুযোগ পাবে।
আজ বিশ্বে শিয়া ও সুন্নি মিলিয়ে ১৬০ কোটিরও বেশি মুসলমান বসবাস করেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠী যদি ঐক্যবদ্ধভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে ইসলামী বিশ্বের স্বার্থ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় তাদের বিপুল সক্ষমতা রয়েছে।
আহলে বাইতের প্রতি সুন্নি মুসলমানদের ভালোবাসা
হুজ্জাতুল ইসলাম কাজী আসকার হজের সময় নিজের বহু বছরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, আহলে সুন্নাতের বহু আলেম আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর ফজিলত ও মর্যাদা নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তাঁর ব্যাপারে অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, সীমিত কিছু ওয়াহাবি গোষ্ঠী ছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ সুন্নি মুসলমানই আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি সম্মান ও বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে তাকান।
ধর্মীয় পবিত্রতার অবমাননা ঐক্যের পরিপন্থী
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজী আসকার অন্যান্য মুসলমানের পবিত্র বিশ্বাস, ধর্মীয় প্রতীক ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের অবমাননা থেকে বিরত থাকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, কিছু গোষ্ঠী শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সুন্নি মুসলমানদের পবিত্র বিশ্বাস ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও গালিগালাজ করে। এমনকি তারা গণমাধ্যমের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে এসব কর্মকাণ্ডকে শিয়া মুসলমানদের নামে প্রচার করে। অথচ এ ধরনের আচরণের সঙ্গে ইমাম খোমেনী (রহ.), সর্বোচ্চ নেতা এবং আহলে বাইতের শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের উদ্ধৃতি দেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ.
“তোমরা তাদের উপাস্যদের গালি দিও না, তাহলে তারা অজ্ঞতাবশত সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহকে গালি দেবে।” [সূরা আল-আনআম, ৬:১০৮]
তিনি বলেন, পবিত্র কোরআন এমনকি মুশরিকদের উপাস্যদেরও অবমাননা করতে নিষেধ করেছে। কারণ, এ ধরনের আচরণ পাল্টা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং একে অপরের পবিত্র বিষয়গুলোর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পথ তৈরি করে। অতএব, মুসলমানদের পারস্পরিক পবিত্র বিশ্বাস ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে অবমাননা করা আরও বেশি অন্যায় ও বিভেদ সৃষ্টিকারী কাজ।
শত্রুর লক্ষ্য মুসলমানদের বিভক্ত করা
হযরত আবদুল আজিম (আ.)-এর পবিত্র মাজারের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, শত্রুরা শিয়া ও সুন্নির মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না; তাদের মূল লক্ষ্য হলো মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।
এর উদাহরণ আমরা দায়েশ বা আইএসআইএসের মতো তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অপরাধের মাধ্যমে দেখেছি। এসব গোষ্ঠী শুধু শিয়া মুসলমানদেরই লক্ষ্যবস্তু করেনি; সুন্নি আলেমদেরও হত্যা করেছে এবং তাদের অনেককে শহীদ করেছে।
ঐক্য সপ্তাহ হোক পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপলক্ষ
তিনি বলেন, ঐক্য সপ্তাহ মুসলমানদের সংহতি আরও শক্তিশালী করা, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের পারস্পরিক পরিচিতি ও বোঝাপড়া বাড়ানো, অভিন্ন বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং ধর্মীয় বিভেদকে উসকে দিয়ে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করতে চায়—এমন সব প্রবণতার মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন কাজী আসকার বলেন, মুসলমানরা যত বেশি নিজেদের অভিন্ন বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেবে এবং পারস্পরিক মতপার্থক্য ও অবমাননা থেকে দূরে থাকবে, ইসলামী বিশ্বের শক্তি ও মর্যাদা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে শত্রুদের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং ইসলামী উম্মাহর ক্ষতি করার সুযোগও তত কমে আসবে।
ঐক্য মানে মতপার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং অভিন্ন বিশ্বাস ও স্বার্থকে সামনে রেখে মতপার্থক্যকে সংঘাত ও শত্রুতায় রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করা।
আপনার কমেন্ট